সময় লোড হচ্ছে…
আজকের পাঠক 17
মোট ভিজিটর 523

অরুণাচলে চিনের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে বড়সড় প্রস্তুতি ভারতের, জওয়ানরা কী করছেন জানেন?

0
f

অরুণাচল প্রদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ও চিনা সেনার মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের খবর সামনে আসায় দুর্গম এলাকায় দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

অরুণাচল প্রদেশে ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে একাধিক জায়গায় মুখোমুখি অবস্থানের খবর। এই পরিস্থিতিতে সীমান্তে নিজেদের অপারেশনাল ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে উদ্যোগী ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (ITBP)। দুর্গম পাহাড়ে দ্রুত জওয়ানদের পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে ড্রোন যুদ্ধ, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার, একাধিক ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল প্রায় দুই ডজন কুইক রেসপন্স ফাইটিং ভেহিকল (QRFV) কেনার পরিকল্পনা। সীমান্তে হঠাৎ উত্তেজনা বাড়লে দ্রুত অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই গাড়িগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

ভারত-চিন সীমান্তে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র শত্রুপক্ষের গতিবিধির উপর নজর রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC)-র একাধিক এলাকায় দুর্গম পাহাড়, তীব্র ঠান্ডা, বরফে ঢাকা রাস্তা এবং সীমিত সড়ক যোগাযোগের কারণে জওয়ানদের দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তের কোনও এলাকায় হঠাৎ উত্তেজনা তৈরি হলে কত দ্রুত অতিরিক্ত বাহিনী পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করে পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা।

এই কারণেই প্রায় দুই ডজন কুইক রেসপন্স ফাইটিং ভেহিকল কেনার পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। QRFV-এর মূল উদ্দেশ্য হল, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তারক্ষীদের দ্রুত নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাহিনী মোতায়েনের ক্ষমতা বাড়ানো। সাধারণ পরিবহণের গাড়ির তুলনায় এই ধরনের বিশেষ সামরিক যান দুর্গম এলাকায় চলাচল এবং অপারেশনাল পরিস্থিতির উপযোগী করে তৈরি করা হয়। তবে গাড়ির নির্দিষ্ট মডেল অনুযায়ী তার সুরক্ষা ব্যবস্থা, যাত্রী বহনের ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য আলাদা হতে পারে।

ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত বিবাদ দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনার মধ্যে সংঘর্ষের পর সীমান্তে পরিকাঠামো, নজরদারি এবং দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অরুণাচল প্রদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ও চিনা সেনার মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের খবর সামনে আসায় দুর্গম এলাকায় দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সীমান্তে কোনও জায়গায় উত্তেজনা তৈরি হলে অতিরিক্ত বাহিনী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং রসদ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

ভারত-চিন সীমান্তের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ITBP। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির মধ্যে সীমান্তে নজরদারি, টহলদারি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এই বাহিনীর কাজের অন্যতম অংশ। ফলে আধুনিক যানবাহন এবং উন্নত পরিকাঠামো তাদের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

সমতলের তুলনায় উচ্চ পার্বত্য এলাকায় যানবাহন চালানো অনেক বেশি কঠিন। সরু রাস্তা, খাড়া বাঁক, তুষারপাত, ভূমিধস এবং তাপমাত্রার তীব্র ওঠানামা গাড়ির কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অনেক সীমান্তবর্তী এলাকায় শেষ চৌকি পর্যন্ত পৌঁছতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। খারাপ আবহাওয়ায় সেই যাত্রা আরও সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে।

তাই শুধু গাড়ি কিনলেই হবে না। পাহাড়ি পরিবেশে চলাচলের উপযোগী যান নির্বাচন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের পর্যাপ্ত জোগানও গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায় গাড়িগুলি মোতায়েন করা হবে এবং সেখানকার ভৌগোলিক পরিস্থিতির সঙ্গে সেগুলি কতটা মানানসই, তার উপরও সাফল্য নির্ভর করবে।

ITBP-র আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা শুধুমাত্র গাড়ি কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সীমান্তে নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বাহিনীর DG শত্রুজিৎ কাপুরের তরফে আধুনিকীকরণ ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত একাধিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের শেষের মধ্যে গোটা বাহিনীকে STRIKE প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার জওয়ানকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৩৩০ জন মাস্টার ট্রেনার তৈরি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।

এই প্রশিক্ষণের লক্ষ্য হল, বদলে যাওয়া অপারেশনাল পরিস্থিতিতে জওয়ানদের প্রস্তুতি, শারীরিক সক্ষমতা, সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো। পাশাপাশি, প্রতিটি সীমান্তরক্ষী ব্যাটালিয়নে ড্রোন প্লাটুন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। দুর্গম এলাকায় নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ জায়গার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং এমন অঞ্চলের উপর নজর রাখতে ড্রোন কার্যকর হতে পারে, যেখানে স্থলপথে পৌঁছনো কঠিন। অন্যদিকে, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ড্রোনের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।

ড্রোন প্রযুক্তিতে ৪০০ কোটি টাকার পরিকল্পনাও রয়েছে। ITBP-র আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত পরিকল্পনায় ড্রোন এবং অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ কোটি টাকার একটি আধুনিকীকরণ বাজেটের ৭০ শতাংশ ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থার জন্য ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকার বৃহত্তর আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা এবং ড্রোন যুদ্ধের জন্য প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ড্রোন তৈরির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও ITBP পদক্ষেপ করছে বলে জানা গিয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির পরিকল্পনাও করা হয়েছে । সীমান্তে জওয়ানদের সুরক্ষার জন্য উন্নত পরিকাঠামো তৈরি করাও ITBP-র আধুনিকীকরণের অন্যতম লক্ষ্য। এর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির পরিকল্পনা। আগামী তিন বছরে মাটির উপরে ও নীচে আশ্রয়স্থলের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

উচ্চ পার্বত্য এলাকায় এই ধরনের আশ্রয়স্থল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র ঠান্ডা থেকে জওয়ানদের রক্ষা করা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিরাপদে রাখা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও দীর্ঘদিন মোতায়েন থাকা, সব ক্ষেত্রেই এগুলি সাহায্য করতে পারে। ITBP-র শীতপ্রধান এলাকায় থাকা ৩৮৩টি ব্যারাকের মধ্যে ৩৪২টিতে ইনসুলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও তথ্য সামনে এসেছে। এর ফলে ব্যারাকের ভিতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কঠিন আবহাওয়ায় জওয়ানদের থাকার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব।

সীমান্ত সুরক্ষার এই পরিকল্পনাকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের জন্য বিশেষ যানবাহন, দুর্গম এলাকায় নজরদারির জন্য ড্রোন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত জওয়ান, এই তিনের সমন্বয়ই কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি। এর পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা সহায়তা এবং রসদের পর্যাপ্ত জোগানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনও এলাকায় দ্রুত গাড়ি পৌঁছে গেলেও যোগাযোগ বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব থাকলে সেই বাহিনীর কার্যক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ভারত-চিন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে ITBP-র আধুনিকীকরণে একাধিক দিককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দুই ডজন QRFV কেনার পরিকল্পনা সেই বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি অংশ। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে গাড়ি কেনা ও মোতায়েনের অগ্রগতি, পাহাড়ি এলাকায় সেগুলির কার্যক্ষমতা এবং অন্যান্য আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের উপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed