চোরবাগানে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে জেলা সফরে শুভেন্দু!
কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির মণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনহারাদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী। চোরবাগানে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে জেলা সফরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । মৃতদের পরিবারের হাতে চেকে তুলে দেওয়ার সঙ্গে চাকরিরও আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। তার এই উদ্যোগকে কটাক্ষ করেন বিরোধীরা।

নবমীর দুপুরে পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া এবং হুগলিতে গিয়ে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেন তাদের হাতে। সঙ্গে সরকারি চাকরির আশ্বাসও দিয়েছেন।

নবমীর দুপুরে জেলায় জেলায় ঘুরে চোরবাগানে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, নদিয়া এবং হুগলিতে গিয়ে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। নিকটজনেদের হাতে তুলে দেন ২৫ লক্ষ টাকার চেক। সঙ্গে পরিবারপিছু একটি করে সরকারি চাকরির আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর সরকারের মতো তৎপরতা আগের সরকার কখনও দেখায়নি। তাই আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের তুলনা করা উচিত নয়।

মঙ্গলবার দুপুরে প্রথমেই শুভেন্দু যান পূর্ব বর্ধমানের বীরপুরে। সেখান থেকে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে এসে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি টগর বেজ এবং তাঁর ১৪ বছরের পুত্র সন্দীপ বেজ। স্ত্রী ও পুত্রকে হারিয়ে দিশাহারা সঞ্জয় বেজের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী দেখা করেন। প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলার পর তাঁর হাতে তুলে দেন ২৫ লক্ষ করে মোট ৫০ লক্ষ টাকার চেক। সেই সঙ্গে পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সঞ্জয় বলেন, ‘‘পুজোয় ঠাকুর দেখতে গিয়ে আমার স্ত্রী, পুত্রকে হারাতে হয়েছে। এই পুজোর মধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন, সান্ত্বনা দিলেন। এটা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। সব রকম সাহায্যের আশ্বাস উনি আমাদের দিয়েছেন।’’

বর্ধমান থেকে শুভেন্দু সোজা চলে যান হুগলির আরামবাগে। সেখানে সঞ্জয়দেরই আত্মীয় পিয়ালি প্রামাণিক চোরবাগানের বিপর্যয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। পিয়ালি ছিলেন সঞ্জয়ের শ্যালকের স্ত্রী। একসঙ্গেই তাঁরা ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। আরামবাগের বালিয়া গ্রামে পিয়ালিদের বাড়িতে পৌঁছে শুভেন্দু ২৫ লক্ষ টাকার চেক দিয়েছেন। পিয়ালির মাসি জানান, মুখ্যমন্ত্রীর তৎপরতায় তাঁরা সন্তুষ্ট। এমনকি, মুখ্যমন্ত্রীকে তিনি ঈশ্বরের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে চাকদহের বাসিন্দা আরতি সরকারের। তাঁর বাড়িতে গিয়েও আর্থিক সাহায্যের চেক তুলে দিয়েছেন শুভেন্দু।

মঙ্গলবার হাওড়ার লিলুয়ায় আনন্দনগর বিদ্যাসাগর পল্লির বাসিন্দা আকৃতি রাউতের বাড়িতেও যান শুভেন্দু। চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে আকৃতির। তাঁর পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে দিয়েছেন ২৫ লক্ষ টাকার চেক।

মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের তো ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু তার পরের দায়িত্বটা পালন করতে হবে। এটা আমাদের কর্তব্য। চোরবাগানের অঘটনে যে সমস্ত পরিবারের চোখে জল, তাদের দুঃখ আমাদেরও দুঃখ। তাই এ বার আমরা শুধু ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করছি। আনন্দ-অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকছি।’’ বিরোধীদের কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে কিছু ঘটনার দৃষ্টান্ত টেনে তিনি বলেন, ‘‘২০২৫ সালে কলকাতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু, দার্জিলিঙের নাগরাকাটায় হড়পা বানে বহু মৃত্যু ঘটেছিল। তার পরেও পুজোর অনুষ্ঠান, ডান্ডিয়া, কার্নিভাল হয়েছে। আগের সরকারের সঙ্গে আমাদের ফারাকটা লোকে দেখতে পাচ্ছে।’’

চাকদহ থেকে শুভেন্দু জানান, কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করছে রাজ্য সরকার। চোরবাগানের ঘটনার তদন্ত করবে ওই কমিটি। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পুলিশ বা কলকাতা পুরসভার কাউকে সেই কমিটিতে রাখা হচ্ছে না। বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর কটাক্ষ, ‘‘আগের সরকারের সময়ে হাঁসখালি বলুন বা অন্য যে কোনও ঘটনা, আমাদের সিবিআই তদন্ত চেয়ে, বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়ে আদালতে যেতে হত। আমি সেই সুযোগ দিইনি। গাফিলতি থাকলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৭ বছরের শ্রীপর্ণা পোদ্দারের। মঙ্গলবার বৈদ্যবাটীতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে শোকস্তব্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শ্রীপর্ণার বাবা-মায়ের বার্ধক্য ভাতা এবং মায়ের চাকরির আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। সেখান থেকে শুভেন্দু বলেন, ‘‘পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলেন শ্রীপর্ণা। রাজারহাটের ক্যানসার হাসপাতালে কাজ করতেন। এই পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে কষ্ট হয়। বয়স্ক বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হারানোর যন্ত্রণা অপূরণীয়। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে শ্রীপর্ণার মায়ের কাজের ব্যবস্থা করার জন্য স্থানীয় বিধায়ককে বলা হয়েছে। শ্রীপর্ণার মা নার্স হিসেবে কাজ করতেন। তাঁকে আবার কাজের সুযোগ দেওয়া গেলে এক দিকে যেমন তিনি সাম্মানিক পাবেন, অন্য দিকে কাজের মধ্যে থাকলে মানসিক ভাবেও কিছুটা ভাল থাকতে পারবেন। পাশাপাশি, শ্রীপর্ণার বাবা-মা দু’জনেরই বার্ধক্য ভাতা চালু করার জন্য ডিএম-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’’ শ্রীপর্ণার মা স্বপ্না পোদ্দার বলেন, ‘‘উনি যতটুকু সাধ্য, চেষ্টা করেছেন। আমরা অনেক সাহায্য পেয়েছি। আমাদের ক্ষতি তো পূরণ করা যাবে না। কিন্তু উনি পাশে আছেন। আমরা কোনও দাবি করিনি।’’

নবমীর পর দশমীর দিনও চোরবাগানে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । বুধবার উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক জায়গায় গিয়ে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক সাহায্যের কথাও ঘোষণা করেন তিনি। গোটা ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটিকে।

দশমীর দিন মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই যান ঘোলা থানার যোগেন্দ্রনগরে মৃত প্রিয়া সমাদ্দারের বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক তথা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী, জেলাশাসক-সহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। প্রিয়ার ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রিয়ার বাবা শ্যামল সমাদ্দার পেশায় দর্জি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রিয়ার মা দীপা সমাদ্দার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং তাঁর বয়স ৩৬ বছর। তাই তাঁকে স্থানীয় বিডিও অফিসে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য জেলাশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, দীপা স্কুটি চালাতে জানলে এবং লাইসেন্স থাকলে যাতায়াতের সুবিধার জন্য তাঁকে একটি স্কুটি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকারের তরফে ২৫ লক্ষ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা— মোট ২৭ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পেয়েছে পরিবারটি। প্রিয়ার মায়ের কথায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের ওই ২ লক্ষ টাকা তাঁর ছোট মেয়ের নামে দেওয়া হয়েছে। শোকার্ত দীপা বলেন, “যে চলে গেছে, তাকে তো আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না। বিডিও অফিসে চাকরির ব্যবস্থা করার কথা আমাদের জানানো হয়েছে।” এই কঠিন সময়ে পরিবারটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দিকে নজর রাখতে স্বাস্থ্য দফতরকে এক জন আশাকর্মী নিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

প্রিয়ার বাড়ির পর বরানগরে মৃত দম্পতি দিলীপ ঘোষ ও দিপালী ঘোষের বাড়িতে যান মুখ্যমন্ত্রী। বাবা-মাকে হারানো ছেলের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, দম্পতির মৃত্যুতে রাজ্য সরকারের তরফে ৫০ লক্ষ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ৪ লক্ষ টাকা (মোট ৫৪ লক্ষ) সরাসরি ওই তরুণের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ওই তরুণের দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব তিনি নিজে নিতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আগরপাড়ায় মৃত প্রাঞ্জল সরকারের বাড়িতেও যান শুভেন্দু। জানতে পারেন প্রাঞ্জল অত্যন্ত প্রতিভাবান ছেলে ছিল। দুর্ঘটনার দিন তাঁর বাবা-মা বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তাঁরা যেহেতু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, তাই তদন্ত কমিটির কাছে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রাঞ্জলের বাবা অনুকূল সরকার বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। যাদের গাফিলতিতে ঘটনাটি ঘটেছে তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না বলে কথা দিয়েছেন তিনি। নিজের ব্যক্তিগত হোয়াট্স্যাপ নম্বর দিয়েছেন আমাকে। সরকারি চেকের পাশাপাশি আমার স্ত্রীকে একটি সরকারি কাজের ব্যবস্থা করে দেবার কথাও বলেছেন।” অনুকূল আরও জানান তাঁর বছর তেরোর ছেলে প্রাঞ্জল জাতীয় স্তরের সাঁতারু ছিল। ছেলের লক্ষ্য পূরণে যে সব পরিকাঠামোগত বাধার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন সেই সংক্রান্ত একটি চিঠি তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়েছেন। ভবিয্যতে যাতে অন্যদের হয়রানি না হতে হয় সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর এই চিঠি।