বিহারে নৌকাডুবিতে মৃত ১৪, নিখোঁজ আরও কয়েকজন
বিহারে নৌকাডুবিতে মৃত ১৪ জনের মধ্যে ৭ জন একই পরিবারের । সকলের বয়স ১৫ বছরের নীচে, নিখোঁজ এখনও কয়েক জন । পাশের গ্রামে নিমন্ত্রণ। সেই উপলক্ষেই রাতের অন্ধকারে নৌকায় চেপে নদী পারাপার। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছনো কিংবা বাড়ি ফেরা হল না আর। মাঝগঙ্গায় আচমকা নৌকাডুবি। মৃত্যু হল ১৪ জনের। জেলা প্রশাসনের হিসেবে, মৃতদের মধ্যে ১৩ জনেরই বয়স পনেরো বছর বা তার কম। মঙ্গলবার রাতে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বিহারের বৈশালী জেলার রাঘোপুর থানা এলাকার রামপুর শ্যামচাঁদ গ্রামের কাছে।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটে। ১৫ থেকে ২০ জন নাবালককে নিয়ে নৌকাটি পাশের গ্রামে ভোজের আসরে যাচ্ছিল। অন্য একটি সূত্রের দাবি, ভোজ খেয়ে ফেরার পথে গঙ্গায় উল্টে যায় ওই নৌকাটি। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি শুরু হয় উদ্ধারকাজ। ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ) এবং স্থানীয় ডুবুরিরা।

বৈশালীর জেলাশাসক বর্ষা সিং সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা খবর পাই, পাশের গ্রামে ভোজ খেতে যাওয়ার পথে ১৫-২০ জন শিশু-কিশোরকে নিয়ে একটি নৌকা ডুবে গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত সাতজনকে উদ্ধার করে এনএমসিএইচ-এ (নালন্দা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল) পাঠানো হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।’ জেলাশাসক আরও জানান, ঘটনাস্থলে এসডিআরএফ-এর একটি দল রয়েছে। স্থানীয় ডুবুরিদের সাহায্য নিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। মোট ১৩টি শিশুর দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রত্যেকেরই বয়স ১৫ বছর বা তার কম।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নৌকাটি মাঝ-নদীতে যেতেই আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তার পরই উল্টে যায়। যাত্রীরা সাহায্য চেয়ে চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু অন্ধকার থাকায় উদ্ধারকাজে সমস্যা হচ্ছিল। তার মধ্যে জলের স্রোত বেশি থাকায় বেশির ভাগ যাত্রীই ভেসে যান।

দুর্ঘটনার পর প্রথমে পাঁচ থেকে আটজনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছিল। পরে জেলাশাসক ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন এবং পরবর্তীতে জানান ১৩ জন নাবালকের মৃত্যু হয়েছে। তবে রাঘোপুরের বিধায়ক তথা আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত গঙ্গা থেকে মোট ১৪টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলা ও শিশু রয়েছে। তেজস্বী জানিয়েছেন, ছ’জন হাসপাতালে ভর্তি এবং তিনজনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে এই দুর্ঘটনার খবর পেয়েই এক্স হ্যান্ডেলে হিন্দিতে পোস্ট করেন তেজস্বী। লেখেন, ‘রাঘোপুর দিয়ারা এলাকায় নৌকাডুবি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতগুলো বাচ্চা ডুবে গেল! ঈশ্বর সকলকে নিরাপদে রাখুন।’ ঘটনার খবর পেয়ে জেলাশাসক বর্ষা সিং, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তেজস্বী। দ্রুত ত্রাণ, উদ্ধারকাজ এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন তিনি। সন্তানহারা পরিবারগুলির প্রতি গভীর সমবেদনাও জানান।

বৈশালীর এই নৌকাডুবির ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের (পিএমও) তরফে এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল (পিএমএনআরএফ) থেকে মৃতদের পরিবারের পিছু ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে।

ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন দেশের উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণনও। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, ‘বিহারের বৈশালী জেলায় গঙ্গা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণহানির খবরে আমি গভীরভাবে শোকাহত। এই ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত সকলের জন্য আমার প্রার্থনা রইল। যারা এখনও নিখোঁজ, তাদের নিরাপত্তার জন্যও প্রার্থনা করি।’

কেন্দ্রের পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছে বিহার সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরি মৃতদের পরিবার পিছু ৪ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘বৈশালীর রাঘোপুরে নৌকা দুর্ঘটনায় নিষ্পাপ প্রাণগুলোর চলে যাওয়ার খবর অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। এই কঠিন সময়ে মৃতদের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল। ঈশ্বর মৃতদের আত্মার শান্তি দিন এবং পরিবারগুলিকে এই অসহনীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন।’ পাশাপাশি উদ্ধারকাজে গতি আনার এবং আহতদের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

নদীপথে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে ফের একবার বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল বৈশালীর এই ঘটনা। আর কেউ নিখোঁজ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে গঙ্গায় তল্লাশি জারি রেখেছে প্রশাসন। কীভাবে নৌকাটি ডুবল, খতিয়ে দেখা হচ্ছে তার কারণও।